কলার দেবী তাই প্রায় সব বিদ্যায়তনেই সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে তবে সাধারণত সব বাড়িতেই সরস্বতী পূজার প্রচলন আছে । কেউ সরস্বতীর মূর্তি পূজা করেন, কেউ ছবিতে । দেবী সরস্বতীর মূর্তি আমরা যা দেখি, তা হল দেবী শ্বেতবসনা,এক হাতে বীণা, অন্য হাতে বরাভয় মুদ্রা, দেবীর বাহন রাজহাঁস । ভারতীয় পুরাণ-সংস্কৃতিতে সরস্বতী বহুমাত্রিক দেবী হিসাবে পরিচিত। আদিতে সরস্বতীর পরিচয় ছিল উত্তর ভারতের সপ্তনদীর ( গঙ্গা, যমুনা, শতদ্রু, বিপাশা, ইরাবতী, চন্দ্রভাগা ও সরস্বতী ) অন্যতমা সরস্বতী নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসাবে। পরবর্তীকালে সেই নদীর দেবতা কী ভাবে শিক্ষা ও সংস্কৃতির অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসাবে পরিচিতি লাভ করল, তা খুবই বিস্ময়ের !

প্রথমে দেখা যাক বিভিন্ন পুরাণগ্রন্থ সরস্বতীর উৎস সম্পর্কে কী বলছে। পদ্মপুরাণে সরস্বতী দক্ষকন্যা এবং কশ্যপ-পত্নী হিসাবে স্বীকৃত। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুসারে সরস্বতী বিষ্ণু বা নারায়ণের পত্নী। কিন্তু পদ্মপুরাণে তিনি কশ্যপ মুণির পত্নী। শিবপুরাণ আর স্কন্ধপুরাণ মতে সরস্বতী আবার শিবেরও পত্নী । ঋগ্বেদ-পরবর্তী হিন্দু শাস্ত্র আলোচনায় সরস্বতী ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর এই ত্রিদেব-এর পত্নী রূপে বর্ণিত হলেও, অধিক প্রচলিত মতে তিনি নারায়ণ-পত্নী।

কোনও কোনও আলোচনায় দেখা যায়, বিষ্ণু বা নারায়ণের তিন স্ত্রী হলেন গঙ্গা, লক্ষ্মী ও সরস্বতী। বিহারীলাল চক্রবর্তী ‘সারদামঙ্গল’ কাব্যে লিখেছেন, ‘‘তুমি লক্ষ্মী-সরস্বতী আমি ব্রহ্মাণ্ডের পতি। হোক গে বসুমতী, যার খুশি তার’’। কিন্তু ‘অতি পবিত্রতার’ কারণে গঙ্গা এবং বিদ্যাবত্তার কারণে সরস্বতী নারায়ণের হৃদয় জয় করতে অসমর্থ হলে বিষ্ণু তাঁদের দু’জনকে যথাক্রমে মহাদেব ও ব্রহ্মাকে দান করে দেন।

অনেক পরবর্তীকালে রচিত ‘মৎস্যপুরাণ’ অনুসারে, পরমাত্মার মুখনিঃসৃত শক্তিগুলির মধ্যে সরস্বতী সর্বশ্রেষ্ঠা । তিনি রূপে দেবীর ন্যায় পরমা সুন্দরী । মহাশ্বেতা (সর্বশুক্ল বা যার সর্বাঙ্গ শ্বেত বর্ণের) ও বীণাবাদিনী । সরস্বতী সম্পর্কে যত পুরাণ-কাহিনি পাওয়া যায়, সেগুলি থেকে, আর যাই হোক, বিদ্যার দেবীকে চরিত্রগত ভাবে শুদ্ধ বলা যায় না ! তাঁর জন্ম, প্রণয়, বিবাহ, যৌনজীবন সব কিছুই খুব জটিল সম্পর্কের আবর্তে ঘূর্ণায়মান। সরস্বতী বিদ্যা ও সংস্কৃতির দেবী হলেও প্রণয়ের ব্যাপারে তিনি খুব একটা সুনামের অধিকারিণী নন।

শুধু হিন্দু ধর্মেই নয়, তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মেও দেবী সরস্বতীর উল্লেখ পাওয়া যায় । এখানে সরস্বতীর রূপ ও আয়ুধের কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যায় । বৌদ্ধ সাধনমালায় দ্বিভুজা সরস্বতীর চার প্রকার ধ্যান আছে, ‘মহাসরস্বতী’,‘বজ্রবীণা সরস্বতী’,‘বজ্রসারদা‘ ও ‘আর্যা সরস্বতী’। মহাসরস্বতী শুভ্র বসনা, শ্বেত পদ্মের উপর দেবী আসীন, দেবীর ডান হাতে বরদমুদ্রা, বাম হাতে সনাল শ্বেত পদ্ম । বজ্রবীণা সরস্বতীও দ্বিভুজা, শ্বেতবর্ণা আর দুই হাতে বীণা ধরে আছেন। মহাসরস্বতীর সঙ্গে বজ্রবীণা সরস্বতীর অনেকটাই মিল দেখা যায় । বৌদ্ধ সাধনমালা অনুযায়ী বজ্রসারদা দ্বিভুজা, পদ্মাসীনা এবং ত্রিনেত্রা; এক হাতে পদ্ম অন্য হাতে পুস্তক । আর্যা সরস্বতী ষোড়শী বালিকার মত উদ্ভিন্নযৌবনা, শ্বেতবর্ণা । ডানহাতে রক্ত পদ্ম ও বাম হাতে সনাল পদ্ম এবং প্রজ্ঞাপারমিতা পুস্তক।

বজ্র সরস্বতী,সরস্বতীর আরেকটি রূপ । বজ্রসরস্বতী রক্তবর্ণা,ত্রিমস্তকযুক্ত, ষড়ভুজা- নীল ও সাদা রঙের তিনটি মুখ । পালযুগের একটি বীণাবাদিনী সরস্বতীর মূর্তি পাওয়া গেছে যেটি বৌদ্ধ সরস্বতীর একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন । এছাড়া পাত্র ও পদ্ম হাতে নালন্দার ব্রোঞ্জের মুর্তি টিও খুবই উল্লেখযোগ্য, এটি নবম শতাব্দীর তৈরি । বিদ্যার দেবী সরস্বতী জৈনদেরও একজন প্রধান দেবী । জৈনরা সরস্বতী কে শ্রুতদেবী নামে অভিহিত করেছেন । মথুরার কঙ্কালটিলায় একটি মস্তকবিহীন (ভাঙ্গা) জৈন দেবী সরস্বতীর একটি মূর্তি পাওয়া গেছে। হিন্দু ধর্মের গণ্ডি অতিক্রম করে দেবী সরস্বতী বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মেও প্রবেশ করেছেন, কিন্তু সব ধর্মেই সরস্বতীকে বিদ্যার দেবী রূপেই দেখা যায় ।

শুধুমাত্র ভারতবর্ষেই নয়, দক্ষিণপূর্ব এশিয়াতেও ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতি বিশেষ ভাবে বিস্তার লাভ করেছিল । সরস্বতী আরাধনার নিদর্শন হিসেবে এখান থেকে দুটি সরস্বতী মূর্তি উদ্ধার হয়েছে। চিনে সরস্বতী ‘তিয়েন-মু‘( Tien-mu) নামে ও জাপানে সরস্বতী ‘বেনতেন‘ নামে পরিচিত । তিব্বতে যেসব সরস্বতীর নিদর্শন পাওয়া গেছে তার অধিকাংশ দেখা গেছে দেবী ময়ূরবাহনা। রাশিয়ার লেনিনগ্রাদ মিউজিয়ামেও একটি সরস্বতী মূর্তি পাওয়া গেছে, মায়ানমারে ত্রিপিটক রক্ষার দেবী হলেন সরস্বতী ।

 Tags:  
 Comment
0

No one commented yet.